• আইন ও আদালত

    বিজিবি সদস্যসহ নিহত ৯

      প্রতিনিধি ২৯ নভেম্বর ২০২১ , ১:২৬:০৪ প্রিন্ট সংস্করণ

    নিউজ ডেস্কঃ

    ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তৃতীয় ধাপেও প্রাণহানি এড়ানো যায়নি। এই ধাপে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রবিবার ভোটের দিন সহিংসতায় নীলফামারীতে একজন বিজিবি সদস্যসহ অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১৩০টি কেন্দ্রে। গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ, জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাইসহ নানা অনিয়মের ঘটনাও ঘটেছে।

    তবে নির্বাচনকে সহিংসতাহীন নির্বাচনের মডেল হিসেবে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার। তিনি বলেন, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এবারের ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ হয়েছে।ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এক হাজার ইউপি এবং ৯টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণের কথা থাকলেও চট্টগ্রাম জেলার ১৪টি ইউপিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সব চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচিত হওয়ায় সেখানে ভোটের প্রয়োজন হয়নি। বাকি ৯৮৬টি ইউপিতে প্রাথমিক হিসেবে ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্র প্রিজাইডিং অফিসারদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ২১টি কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।

    নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের পশ্চিম দলিরাম মাঝাপাড়া কেন্দ্রে গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে পিটিয়ে বিজিবির নায়েক রুবেল হোসেনকে (৩০) হত্যা করা হয়েছে।প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রের ঘোষিত ফল প্রত্যাখ্যান করে লাঙল প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী মারুফ হোসেনের সমর্থকরা লাঠিসোঁটা নিয়ে ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। আত্মরক্ষার্থে বিজিবি সদস্য রুবেল কেন্দ্রের একটি কক্ষে আশ্রয় নেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ কর্মীরা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। এ সময় পুলিশের গাড়ি ও ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায় তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। পরে রাত ১১টার দিকে পুলিশ এসে বিজিবি সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে।

    প্রিজাইডিং অফিসার ললিত চন্দ্র রায় বলেন, হামলায় তিনি নিজে, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, কয়েকজন পুলিশ, বিজিবি, আনসার সদস্যসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন।
    মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলের বাংলাবাজারে পৃথক সহিংসতার ঘটনায় শাকিল মোল্লা (৩০) ও রিয়াজুল শেখ (৬০) নিহত হন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। তবে এসব ঘটনায় নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।নরসিংদীতে পৃথক ঘটনায় নিহত হয়েছেন দুজন। রায়পুরার চান্দেরকান্দিতে ভোট গণনা শেষে সংঘর্ষে আরিফ (২৮) নামের এক অটোরিকশাচালক নিহত হন।

    উত্তরবাখরনগর ইউনিয়নে পৃথক সংঘর্ষে আহত ফরিদ মিয়া (৩২) নামের আরেকজন ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান।
    ভোটের সময় বিভিন্ন ইউনিয়নে বিচ্ছিন্ন হামলা, ধাওয়াধাওয়ি, ককটেল বিস্ফোরণ এবং কমপক্ষে ২৫ জন গুলিবিদ্ধসহ ৫০ জন আহত হন। সদর উপজেলার করিমপুর, নজরপুর, চিনিশপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে এসব ঘটনা ঘটে।সদর হাসপাতালে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মো. আবদুল বাকী বলেন, হাসপাতালে বিকেল ৪টা পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ ২৫ জনসহ ৫০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

    ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার খনগাঁও ইউনিয়নের ঘিডোব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গুলিতে সাহাবলি হুসেন (৩৫) এবং মজাহারুল (৪০) নিহত হন। আহত হয়েছেন আরো ছয়জন। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ইউপি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র এলাকায় সহিংসতায় আহত হন ছাত্রলীগ নেতা সাজ্জাদ হোসেন সজিব। বিকেল ৫টার দিকে ঢাকায় নেওয়ার পথে চাঁদপুরে অ্যাম্বুল্যান্সে তিনি মারা যান।

    আগের রাতে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ভাদুর ইউনিয়ন থেকে পুলিশ স্থানীয় পৌর ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ আলম সিদ্দিকী জীবনসহ ৩১ জনকে দেশীয় অস্ত্রসহ আটক করে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এ এইচ এম কামরুজ্জামান।

    ভোট শুরুর আগে খুলনার তেরখাদা উপজেলার মধুপুরে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থক বাবুল শিকদারের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে ভোটের প্রচার চালানোর সময় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা তাঁকে হাতুড়িপেটা ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। পরে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় নেওয়ার পথে গতকাল ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।

    ব্যালট ছনিতাই, কেন্দ্র দখল

    মৌলভীবাজারের বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের একটি ভোটকেন্দ্রে নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থী নাহিদ আহমেদ বাবলুর সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছ থেকে ছিনিয়ে ১৩৪টি ব্যালট পেপারে সিল মারার অভিযোগ পাওয়া যায়।

    দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ, নেত্রকোনার কলমাকান্দা, যশোরের শার্শা, মেহেরপুর সদর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখলসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

    কুমিল্লার বরুড়ায় ঝলম ইউনিয়নের ঢেউয়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাত ও কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার সময় পুলিশ কর্মকর্তার পিস্তলও ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পরে ওই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়।

    নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ফতেপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের অভিযোগে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।

    উপজেলায় সনমান্দী ইউপি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সাইফুল ইসলাম প্রধান বলেন, ফতেপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিকেলের দিকে কয়েক শ দুর্বৃত্ত ঢুকে একটি ব্যালট বাক্স ও ১০০ পৃষ্ঠার একটি ব্যালট বই ছিনিয়ে নেয়। এর পরই ওই কেন্দে র ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।

    ঢাকার কেরানীগঞ্জে জাল ভোট দেওয়ার ছবি তুলতে গিয়ে গণমাধ্যমের কর্মীরা হামলার শিকার হন। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়।

    সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বাঙ্গালার প্রতাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নৌকা প্রতীকে প্রকাশ্যে সিল মারতে দেখা যায়। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মোজদার হোসেন বলেন, ‘এটি নৌকা প্রার্থীর নিজস্ব কেন্দ্র। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টরা কেউ কেন্দ্রে নেই। প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। তাই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

    শেরপুরের নকলা উপজেলার গৌড়দ্বার ইউনিয়নের পাইস্কা এলাকায় ভোটকেন্দে র বাইরে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই গণমাধ্যমকর্মী হামলার শিকার হন।

    গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের শ্রীপুর ইউপির বৌলজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এক মেম্বার প্রার্থী দুপুর ১২টার দিকে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে পুলিশ ১২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় সংঘর্ষে পুলিশ কনস্টেবল মোমিনুল ও মাহবুব মিয়া আহত হন।

    খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার দুটি ইউপির তিনটি কেন্দ্রে দুপুরের দিকে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টায় সংঘর্ষ ও ধাওয়াধাওয়ির ঘটনায় এক পুলিশ সদস্যসহ ১৯ জন আহত হন। এসব ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। একটি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। আরেকটি কেন্দ্রে সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ ১৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। সংঘর্ষে এক চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ আহত হন অন্তত ১০ জন।

    ভোলার চরফ্যাশনে চর কুকুরিমুকরিতে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১০ জন আহত হন।

    ময়মনসিংহের ত্রিশালের রামপুর ইউনিয়নে বড়মা কাকচর মাদরাসা ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর পরই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ২৭ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে। এ ঘটনায় দুপুর ২টা থেকে এক ঘন্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল।

    চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চিকনদণ্ডীতে একটি কেন্দ্রে গুলি ও আরেকটি কেন্দ্রে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার মির্জাপুর, ধলই ও উত্তর মাদাশরা ইউনিয়নের একাধিক কেন্দ্রেও সংঘর্ষ, ধাওয়াধাওয়ি হয়েছে। চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের দুই কেন্দ্রে আধাঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়।

    ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুরের উত্তর মন্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তাত্ক্ষণিক ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৪ মেম্বার প্রার্থীসহ ১৩ জনকে আটক করা হয়।

    আরও খবর

                       

    জনপ্রিয় সংবাদ